ইতিবাচক ও নেতিবাচক শান্তি (Positive and Negative Peace) সম্পর্কে আলোচনা কর।
শান্তি মানব সমাজের একটি মৌলিক আকাঙ্ক্ষা। তবে, শান্তির ধারণাটি সরল নয়। একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়। মূলত, শান্তিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: নেতিবাচক শান্তি ও ইতিবাচক শান্তি। এই দুটি ধারণা শান্তি কী এবং কীভাবে অর্জন করা যায়, সে সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
নেতিবাচক শান্তি:
সহজভাবে বলতে গেলে, নেতিবাচক শান্তি হলো হিংসা বা সহিংসতার অনুপস্থিতি। এটি শান্তির প্রাথমিক এবং সবচেয়ে সংকীর্ণ ধারণা। যখন কোনো স্থানে যুদ্ধ, মারামারি, হানাহানি, বা শারীরিক আক্রমণ থাকে না, তখন সেখানে নেতিবাচক শান্তি বিদ্যমান বলে ধরা হয়। নেতিবাচক শান্তি মূলত দৃশ্যমান এবং সরাসরি শারীরিক বা সামরিক সংঘাতের অভাবের উপর জোর দেয়।
অন্যভাবে বলা যায়, নেতিবাচক শান্তি মানে হলো “যুদ্ধ নেই”। একটি দেশ, সমাজ বা গোষ্ঠীতে যদি কোনো প্রকাশ্য যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘাত না থাকে, তবে সেটি নেতিবাচক শান্তির উদাহরণ।
যেমন ধরুন, দুটি দেশের মধ্যে কোনো যুদ্ধ চলছে না। এটি নেতিবাচক শান্তির একটি উদাহরণ। অথবা, একটি শহরে কোনো দাঙ্গা বা মারামারি হচ্ছে না, সেটিও নেতিবাচক শান্তি। এমনকি, একটি পরিবারের সদস্যরা যদি শারীরিক ভাবে ঝগড়াঝাঁটি বা মারামারি না করে, তবে সেখানেও নেতিবাচক শান্তি রয়েছে।
নেতিবাচক শান্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষের জীবন এবং সম্পত্তিকে তাৎক্ষণিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। তবে, এটি শান্তির একটি সীমিত ধারণা। নেতিবাচক শান্তি সমাজের গভীরে থাকা বিভিন্ন সমস্যা, যেমন – বৈষম্য, অবিচার, দারিদ্র্য, বা শোষণকে উপেক্ষা করে। এই সমস্যাগুলো কাঠামোগত এবং সাংস্কৃতিক সহিংসতার জন্ম দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিবাচক শান্তি:
ইতিবাচক শান্তি, নেতিবাচক শান্তির চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং গভীর ধারণা। এটি কেবল শারীরিক সহিংসতার অভাব নয়, বরং কাঠামোগত এবং সাংস্কৃতিক সহিংসতার অনুপস্থিতি এবং আরও অনেক কিছুকে বোঝায়। ইতিবাচক শান্তি এমন একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ন্যায়বিচার, সমতা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, সহনশীলতা এবং সহযোগিতা বিদ্যমান। যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সুযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
অন্য কথায়, ইতিবাচক শান্তি শুধুমাত্র “যুদ্ধ নেই” এমন নয়, বরং “ন্যায়বিচার আছে” এমন অবস্থাকেও বোঝায়। এটি সমাজের সেই গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করে, যা সহিংসতা এবং সংঘাতের মূল কারণ।
ইতিবাচক শান্তি অর্জনের জন্য বেশ কিছু উপাদান অপরিহার্য। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উল্লেখ করা হলো:
- ন্যায়বিচার ও সমতা: সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা বর্ণের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা চলবে না। সকলের অধিকার সমানভাবে রক্ষা করতে হবে।
- সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: একটি কার্যকর এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা মানুষের চাহিদা ও অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
- অর্থনৈতিক সুযোগ ও উন্নয়ন: দারিদ্র্য দূর করতে হবে, নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে। সকলের জন্য একটি সম্মানজনক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে হবে।
- মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা: মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, একত্রিত হওয়ার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতি: সহনশীলতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে হবে।
- পরিবেশগত স্থিতিশীলতা: প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে এবং পরিবেশের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পরিবেশের অবনতিও সংঘাতের কারণ হতে পারে।
কিছু উদাহরণের মাধ্যমে ইতিবাচক শান্তিকে আরও ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে। যেমন, একটি সমাজে যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, এবং ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই ন্যায়বিচার পায়, সেটি ইতিবাচক শান্তির উদাহরণ। আবার, একটি দেশে যেখানে সকলের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমান সুযোগ রয়েছে, যেখানে বেকারত্ব কম এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত, সেটিও ইতিবাচক শান্তি। এছাড়া, একটি সমাজে যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষ শান্তিতে একসাথে বসবাস করে, যেখানে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতা বিদ্যমান, সেটি ইতিবাচক শান্তির দৃষ্টান্ত।
নেতিবাচক শান্তি এবং ইতিবাচক শান্তির মধ্যে পার্থক্য:
নেতিবাচক শান্তি এবং ইতিবাচক শান্তির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো তাদের লক্ষ্যের পরিধি এবং গভীরতা। নেতিবাচক শান্তি মূলত তাৎক্ষণিক সহিংসতা বন্ধ করার উপর দৃষ্টি দেয়, যেখানে ইতিবাচক শান্তি একটি ন্যায্য, স্থিতিশীল ও উন্নত সমাজ গঠনের দিকে মনোনিবেশ করে। নেতিবাচক শান্তি সংকীর্ণ ও সীমিত, অন্যদিকে ইতিবাচক শান্তি ব্যাপক ও বিস্তৃত। নেতিবাচক শান্তি মূলত সমস্যার লক্ষণগুলো (যেমন সহিংসতা) দূর করতে চায়, কিন্তু ইতিবাচক শান্তি সমস্যার মূল কারণগুলো (যেমন অবিচার, বৈষম্য) সমাধানের চেষ্টা করে।
সম্পর্ক:
নেতিবাচক শান্তি ও ইতিবাচক শান্তি একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। নেতিবাচক শান্তি প্রায়শই ইতিবাচক শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে। শারীরিক সহিংসতা বন্ধ না হলে, সমাজের গভীর সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং ইতিবাচক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, শুধুমাত্র নেতিবাচক শান্তি যথেষ্ট নয়। দীর্ঘস্থায়ী ও প্রকৃত শান্তি নিশ্চিত করতে হলে, ইতিবাচক শান্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য।
উপসংহার:
শান্তি শুধুমাত্র যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়। সত্যিকারের শান্তি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে শারীরিক সহিংসতার অভাবের সাথে সাথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতিবাচক শান্তি জরুরি হলেও, ইতিবাচক শান্তি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই শান্তির ভিত্তি তৈরি করে। একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়তে হলে, আমাদের উভয় প্রকার শান্তির গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং ইতিবাচক শান্তির লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।
Download PDF