শান্তি স্থাপনে বস্তুবাদী মতবাদ (Realist Theory) আলোচনা কর।
বস্তুবাদী মতবাদ শান্তি স্থাপনের আলোচনায় ভাববাদী মতবাদের একটি বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। এই মতবাদ অনুসারে, মানুষের ধারণা বা আদর্শ নয়, বরং বস্তুগত উপাদান এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং শান্তির মূল চালিকাশক্তি। বস্তুবাদীরা মনে করেন যে সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সম্পদের বিতরণ, ক্ষমতা কাঠামো এবং ভৌগোলিক উপাদানগুলোই মূলত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সহযোগিতা এবং সংঘাতের প্রকৃতি নির্ধারণ করে।
বস্তুবাদী মতবাদের মূল ধারণা:
- বস্তুগত বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: বস্তুবাদী মতবাদ বস্তুগত বাস্তবতাকে প্রাথমিক এবং প্রধান হিসাবে গণ্য করে। এটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) দ্বারা প্রভাবিত, যা মনে করে সমাজের ইতিহাস মূলত অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং শান্তিও এই বস্তুগত পরিস্থিতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত।
- অর্থনৈতিক উপাদান ও শ্রেণী সংগ্রাম: বস্তুবাদীরা মনে করেন যে অর্থনৈতিক উপাদান, যেমন সম্পদ, বাণিজ্য, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। শ্রেণী সংগ্রাম এবং অর্থনৈতিক শোষণ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই সংঘাতের প্রধান কারণ। ধনী ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শোষণ আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের জন্ম দেয়।
- ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ: বস্তুবাদীরা ক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে দেখেন। রাষ্ট্রসমূহ মূলত নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। নৈতিকতা বা আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা এবং স্বার্থের হিসাব-নিকাশই রাষ্ট্রীয় আচরণকে বেশি প্রভাবিত করে।
- রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব: বস্তুবাদীরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর জোর দেন এবং মনে করেন যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান অভিনেতা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বা আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে না যতক্ষণ না রাষ্ট্রগুলো স্বেচ্ছায় তা মেনে নেয়। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজ স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করে এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা গৌণ।
- সংঘাত অনিবার্য: বস্তুবাদীরা মনে করেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংঘাত একটি স্বাভাবিক এবং প্রায় অনিবার্য ঘটনা। কারণ সম্পদের অভাব, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব সবসময়ই বিদ্যমান থাকবে। স্থায়ী শান্তি একটি ইউটোপিয়ান ধারণা এবং সংঘাত ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
বস্তুবাদী মতবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বস্তুবাদী মতবাদের শিকড় উনিশ শতকের কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের তত্ত্ব, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং শ্রেণী সংগ্রামের উপর জোর দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব বিংশ শতাব্দীতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। মার্কসবাদী এবং নব্য-মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং অর্থনৈতিক শোষণের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পুঁজিবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে বস্তুগত স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হতো।
বস্তুবাদী মতবাদের প্রকারভেদ:
বস্তুবাদী চিন্তাধারার মধ্যে বিভিন্ন প্রকারভেদ দেখা যায়:
- মার্কসবাদ ও নব্য-মার্কসবাদ: এই ধারাটি পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনার উপর জোর দেয়। তারা মনে করেন যে ধনী রাষ্ট্রগুলো দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করে এবং এই শোষণই আন্তর্জাতিক সংঘাতের মূল কারণ। বিশ্ব বিপ্লব এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তি সম্ভব।
- নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Dependency Theory): এই তত্ত্বটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে উন্নত দেশগুলোর শোষণমূলক অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করে। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যেকার সম্পর্ক অসম এবং প্রান্তীয় দেশগুলো কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল থাকার কারণে তারা দুর্বল ও সংঘাতপ্রবণ থাকে।
- বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব (World Systems Theory): ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব বিশ্বকে একটি পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি হিসাবে দেখে, যেখানে কেন্দ্র, প্রান্ত এবং আধা-প্রান্ত অঞ্চল বিদ্যমান। এই তত্ত্ব অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ক্ষমতার অসম বন্টনকে আন্তর্জাতিক সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
- ভূ-রাজনীতি (Geopolitics): ভূ-রাজনীতি ভৌগোলিক উপাদান, যেমন অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব, রাষ্ট্রীয় আচরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর কিভাবে প্রভাব ফেলে তা বিশ্লেষণ করে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার ভৌগোলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণ হতে পারে।
বস্তুবাদী মতবাদের সমালোচনা:
বস্তুবাদী মতবাদেরও কিছু সমালোচনা রয়েছে:
- আদর্শ ও সংস্কৃতির উপেক্ষা: সমালোচকরা মনে করেন বস্তুবাদীরা মানুষের ধারণা, সংস্কৃতি, আদর্শ এবং পরিচয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল বস্তুগত উপাদান দ্বারা চালিত হয় না, এখানে ভাবাদর্শ, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- সহযোগিতার অভাব: বস্তুবাদীরা সংঘাতের উপর বেশি জোর দেন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কম দেখেন। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মহামারী প্রতিরোধ এবং বাণিজ্য চুক্তি।
- অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ধারকবাদ: অনেকে বস্তুবাদীদের অর্থনৈতিক নির্ধারকবাদের সমালোচনা করেন। তারা মনে করেন যে অর্থনীতি সবকিছু নির্ধারণ করে না, বরং রাজনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- রাষ্ট্র কেন্দ্রিকতা: বস্তুবাদীরা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান অভিনেতা হিসাবে দেখেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অরাষ্ট্রীয় অভিনেতা, যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং এনজিওগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বস্তুবাদী মতবাদের আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা:
সমালোচনা সত্ত্বেও, বস্তুবাদী মতবাদের প্রাসঙ্গিকতা আজও বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা কাঠামো এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য: বিশ্বজুড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান, যা দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের জন্ম দেয়। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যেকার ব্যবধান কমাতে না পারলে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
- সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা: প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন তেল, গ্যাস, পানি এবং খনিজ সম্পদ, দখলের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় আঞ্চলিক সংঘাত এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়।
- ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বিভিন্ন অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে এবং বিশ্ব শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
- সামরিকীকরণ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা: বিশ্বব্যাপী সামরিকীকরণ এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ছে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি করছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
উপসংহার:
বস্তুবাদী মতবাদ শান্তি স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। এটি অর্থনৈতিক উপাদান, ক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ এবং বস্তুগত বাস্তবতার উপর জোর দেয়। যদিও এর কিছু সমালোচনা রয়েছে, তবুও বর্তমান বিশ্বে এর প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করা যায় না। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বস্তুবাদী বিশ্লেষণ এবং ভাববাদী আদর্শ – এই দুটির সমন্বয় প্রয়োজন। বস্তুগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল আদর্শবাদী হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন, আবার শুধু ক্ষমতার রাজনীতি দিয়েও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়। শান্তি স্থাপনের জন্য বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আদর্শবাদী নীতি গ্রহণ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বুঝতে এবং শান্তির জন্য কার্যকর কৌশল তৈরি করতে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।
Download PDF