শান্তি সংক্রান্ত কান্টের দৃষ্টিকোণ (Kantian Perspective)


Home » Notes » Chapter 4 – Some Philosophical Approaches to Peace and Conflict Resolution » শান্তি সংক্রান্ত কান্টের দৃষ্টিকোণ (Kantian Perspective)

কান্টের শান্তি বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে। তিনি মনে করতেন যে নৈতিক প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা উভয়ই স্থায়ী শান্তির জন্য অপরিহার্য। তাঁর ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ (Perpetual Peace) নামক গ্রন্থে, কান্ট এমন একটি বিশ্ব ব্যবস্থার রূপরেখা দেন যেখানে যুদ্ধ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হবে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কান্টের এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর নির্ভরশীল: নৈতিকতা, প্রজাতন্ত্র (republicanism), এবং আন্তর্জাতিক আইন।

নৈতিকতা ও শান্তি

কান্ট মনে করতেন নৈতিক আচরণই শান্তির ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁর মতে, প্রতিটি মানুষের সহজাত নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, যা তাদের ‘কর্তব্য’ (duty) পালনে বাধ্য করে। কান্টের নৈতিক দর্শন, যা ‘কর্তব্যবাদ’ (deontology) নামে পরিচিত, অনুসারে, মানুষের কাজ তার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং কাজটি নৈতিকভাবে সঠিক কিনা তার উপর ভিত্তি করে বিচার করা উচিত। কান্ট ‘নিরপেক্ষ অনুজ্ঞা’ (categorical imperative) -এর ধারণা দেন, যা একটি সার্বজনীন নৈতিক নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, আমাদের এমনভাবে কাজ করা উচিত যাতে আমাদের কাজের নিয়মটি একটি সার্বজনীন আইনে পরিণত হতে পারে।

কান্ট বিশ্বাস করতেন যে, যদি ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র উভয়ই নৈতিক নীতি মেনে চলে, তাহলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। নৈতিকতা মানুষকে ন্যায়পরায়ণতা, সম্মান ও সহানুভূতির সাথে আচরণ করতে শেখায়, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। নৈতিক মানুষ যুক্তি ও বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা তাদেরকে যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা ও সমঝোতার পথে চালিত করে।

চিরস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত ও শর্ত

কান্ট চিরস্থায়ী শান্তির জন্য কিছু পূর্বশর্ত ও শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। এই শর্তগুলো মূলত রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত, যা বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। কান্টের ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ গ্রন্থের তিনটি ‘চূড়ান্ত ধারা’ (Definitive Articles) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

  1. প্রত্যেক রাষ্ট্রে প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান (Republican Constitution): কান্ট মনে করতেন যে প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান চিরস্থায়ী শান্তির প্রথম এবং অপরিহার্য শর্ত। প্রজাতন্ত্রে, নাগরিকরা আইনের শাসনের অধীনে থাকে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। যেহেতু নাগরিকরাই যুদ্ধের কষ্ট ও মূল্য সবচেয়ে বেশি ভোগ করে, তাই তারা সাধারণত যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকে। কান্ট যুক্তি দেন যে, যখন জনগণের সম্মতি প্রয়োজন হয় যুদ্ধ শুরু করার জন্য, তখন যুদ্ধ শুরু করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। প্রজাতান্ত্রিক সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তির প্রতি আগ্রহী হয়।
  2. জাতিসমূহের মধ্যে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো (Federation of Free States): কান্ট একটি বিশ্ব সরকারের ধারণার বিরোধিতা করেন, কারণ তিনি মনে করতেন যে এটি স্বেচ্ছাচারী হতে পারে। পরিবর্তে, তিনি ‘জাতিসমূহের একটি যুক্তরাষ্ট্র’ (federation of nations) গঠনের প্রস্তাব করেন, যা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হবে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হবে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। কান্ট এটিকে ‘শান্তি জোট’ (pacific federation) হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন না করে, শুধুমাত্র শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কাজ করবে। এই জোট প্রতিটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষা করবে এবং বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।
  3. বিশ্ব নাগরিকত্বের অধিকার (Cosmopolitan Right): কান্ট ‘বিশ্ব নাগরিকত্বের অধিকার’ -এর ধারণা দেন, যা প্রতিটি মানুষকে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে স্বাগত জানানোর অধিকার দেয়, যতক্ষণ না তারা শান্তিপূর্ণভাবে আচরণ করে। এই অধিকার মূলত আতিথেয়তার অধিকার (right to hospitality), যা জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করে। কান্ট মনে করতেন যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব নাগরিকত্বের অধিকার বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে এবং জাতিগত বিদ্বেষ ও সংঘাত হ্রাস করে।

অতিরিক্ত শর্তাবলী ও বিবেচ্য বিষয়

উপরিউক্ত তিনটি চূড়ান্ত ধারার পাশাপাশি, কান্ট আরও কিছু ‘প্রাথমিক ধারা’ (Preliminary Articles) -এর কথা উল্লেখ করেছেন যা শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সহায়ক হতে পারে। এই ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • কোনো রাষ্ট্র ভবিষ্যতে যুদ্ধ শুরু করার অভিপ্রায় নিয়ে গোপন চুক্তি করতে পারবে না।
  • কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রকে উত্তরাধিকার, বিনিময়, ক্রয় বা দানের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের অধীনে আনা যাবে না।
  • স্থায়ী সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করতে হবে।
  • রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করা উচিত নয়।
  • অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
  • যুদ্ধকালে এমন কোনো কৌশল ব্যবহার করা উচিত নয় যা ভবিষ্যতে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে দেয় (যেমন গুপ্তহত্যা, চুক্তি ভঙ্গ ইত্যাদি)।

কান্টের মতে, প্রকৃতিও সম্ভবত চিরস্থায়ী শান্তির দিকে মানবজাতিকে পরিচালিত করছে। তাঁর ‘প্রকৃতির নিশ্চয়তা’ (guarantee of perpetual peace by nature) ধারণাটি অনুসারে, মানুষের মধ্যে যুক্তি ও আত্মস্বার্থের প্রবণতা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে শান্তির পথে চালিত করবে। বাণিজ্য এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করে।

সমালোচনা ও প্রাসঙ্গিকতা

কান্টের শান্তি বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে তাঁর প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী নয় এবং এটি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত প্রতিরোধ করতে পারবে না। আবার কেউ কেউ বিশ্ব নাগরিকত্বের ধারণাকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে মনে করেন।

তবে, কান্টের শান্তি বিষয়ক ধারণা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর নৈতিকতা, প্রজাতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক আইনের উপর জোর দেওয়া বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বর্তমান যুগে, যখন বিশ্বায়ন বাড়ছে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে উঠছে, তখন কান্টের ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ -এর আদর্শ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কান্টের প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিফলন এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।

মোটকথা, কান্টের শান্তি সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ নৈতিকতা ও রাজনৈতিক কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নৈতিক মানুষ এবং প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাঁর এই ধারণা আজও শান্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।


Download PDF


Leave a comment